খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০১৫, ২:৫৫ এএম
ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে বাংলাদেশ মানেই বৈচিত্র্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। কেউ ছোটেন সবুজে ঘেরা পাহাড়ের টানে, কেউবা সমুদ্রের উত্তাল গর্জনে। কিন্তু আপনি যদি এমন এক অঞ্চলের খোঁজে থাকেন যেখানে একই সাথে প্রমত্তা নদীর বিশালতা, শত বছরের প্রাচীন রাজকীয় ইতিহাস, অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং আধ্যাত্মিক শান্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে, তবে আপনাকে স্বাগত শরীয়তপুর জেলায়।
বিখ্যাত ফরায়েজী আন্দোলনের অগ্রদূত হাজী শরীয়তুল্লাহর নামানুসারে গড়ে ওঠা এই জেলাটি প্রমত্তা পদ্মা, মেঘনা আর কীর্তিনাশা নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত। এক সময় ঢাকা থেকে শরীয়তপুর যাওয়া মানেই ছিল ফেরিঘাটের অনিশ্চিত দুর্ভোগ। কিন্তু স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর শরীয়তপুরের পর্যটন খাতে এসেছে এক অভাবনীয় বিপ্লব। এখন ঢাকা থেকে মাত্র ২ থেকে আড়াই ঘণ্টায় আপনি পৌঁছে যেতে পারেন এই রূপসী জেলায়। চলুন, শরীয়তপুর জেলার পর্যটনের অলিতে-গলিতে এক দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর ভার্চুয়াল ভ্রমণে বের হওয়া যাক।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের আসল রূপ যদি দেখতে চান, তবে শরীয়তপুরের নদী তীরবর্তী স্থানগুলো আপনার মন জয় করবেই।
বর্তমান সময়ে শরীয়তপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হলো সখিপুরের আনন্দবাজার বেড়িবাঁধ। প্রমত্তা পদ্মার পাড় ঘেঁষে তৈরি এই দীর্ঘ বাঁধটির সামনে দাঁড়ালে ক্ষণিকের জন্য মনে হবে আপনি কোনো সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে আছেন।
কেন যাবেন: বিশাল পদ্মার বুকে আছড়ে পড়া ঢেউ আর দূর দিগন্তে সূর্যাস্ত যাওয়ার দৃশ্য এখান থেকে অদ্ভুত সুন্দর দেখায়।
মূল আকর্ষণ: বিকেলের মৃদু বাতাসে বাঁধের ওপর হাঁটা এবং সন্ধ্যার মুখে চরের তাজা ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়া। এখানকার ছোট ছোট অস্থায়ী হোটেলগুলোতে পদ্মার একদম টাটকা ইলিশ, বোয়াল ও চিংড়ি মাছ ভাজা পাওয়া যায়, যা জিভে জল এনে দেয়।
চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের প্রবেশদ্বার এই আলুর বাজার ফেরিঘাটটি মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত। যদিও পদ্মা সেতু হওয়ার পর এর ব্যস্ততা কিছুটা কমেছে, কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এর আকর্ষণ কমেনি। মেঘনার বিশাল জলরাশি, নদীতে সারি সারি নৌকার চলাচল এবং মেঘনার সুস্বাদু ইলিশের স্বাদ নিতে এখনো প্রতিদিন বহু মানুষ এখানে ভিড় করেন।
প্রকৃতির মাঝে যারা একটু শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ খুঁজছেন, তাদের জন্য আদর্শ হলো ঐতিহাসিক মহিষারের দীঘি। বিশাল এই জলাশয়টি ঘিরে রয়েছে নানা প্রাচীন লোককাহিনী। দীঘির চারপাশের সবুজ গাছপালা আর শান্ত টলটলে পানি আপনার শহরের যান্ত্রিক ক্লান্তি এক নিমেষেই দূর করে দেবে।
শরীয়তপুরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন প্রভাবশালী জমিদারদের শাসন আমলের গৌরবময় ইতিহাস। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এই জেলাটি এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার রুদ্রকর গ্রামে অবস্থিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি এই জেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
ইতিহাস: আনুমানিক দেড়শ বছরেরও বেশি পুরনো এই জমিদার বাড়ির প্রাসাদটি এখন ধ্বংসাবশেষ হলেও এর স্থাপত্যশৈলী আজো মানুষকে মুগ্ধ করে।
রুদ্রকর মঠ: এই বাড়ির মূল আকর্ষণ হলো এর সুউচ্চ ও প্রাচীন মঠটি। নিপুণ কারুকার্যখচিত এই মঠটির চূড়া দূর থেকেও নজর কাড়ে। এর দেয়ালে সনাতন ঐতিহ্যের নানা মোটিফ খোদাই করা রয়েছে।
নড়িয়া উপজেলার কার্তিকপুর জমিদার বাড়ি এক সময় এই অঞ্চলের ক্ষমতার মূল উৎস ছিল। এখানে এলে দেখা মিলবে বিশাল দীঘি ও ভাঙা অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ। অন্যদিকে, হাটুরিয়া জমিদার বাড়িটিও তৎকালীন আভিজাত্যের এক অনন্য স্বাক্ষর বহন করছে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও জমিদার বাড়িটি তার বিশাল প্রবেশদ্বার এবং রাজকীয় দিঘির জন্য পরিচিত। অন্যদিকে, লাকার্তা শিকদার বাড়িটি গ্রামীণ স্থাপত্য ও আভিজাত্যের এক দারুণ প্রতিচ্ছবি। এছাড়া বুড়ির হাট মুন্সী বাড়ীও প্রাচীন পারিবারিক ঐতিহ্যের এক সুন্দর স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
মুঘল সম্রাট আকবরের বিখ্যাত সেনাপতি রাজা মানসিংহের নাম শোনেননি এমন মানুষ কমই আছেন। শরীয়তপুরের মাটিতে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক মানসিংহের স্মৃতিবিজড়িত প্রাচীন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। লোককাহিনী অনুযায়ী, এই অঞ্চলে এক বিশেষ সামরিক অভিযানে এসে তিনি ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে মানসিংহের বাড়ি নামে পরিচিতি পায়।
শরীয়তপুর জেলাকে বলা হয় সুফি সাধক ও আধ্যাত্মিক চেতনার অন্যতম কেন্দ্রস্থল। যুগে যুগে এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের মেলবন্ধন ঘটেছে।
নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর নামক স্থানে অবস্থিত এই প্রাচীন শিবলিঙ্গটি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত। বিশাল আকৃতির এই শিবলিঙ্গটির প্রাচীন কারুকার্য দেখার জন্য প্রতি বছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য গবেষক ও তীর্থযাত্রী এখানে ছুটে আসেন।
নড়িয়া উপজেলায় কীর্তিনাশা নদীর তীরে অবস্থিত এই দরবার শরীফটি পুরো অঞ্চলের আধ্যাত্মিকতার মূল কেন্দ্র। হযরত জানশরীফ শাহ সুরেশ্বরী (র.)-এর এই পবিত্র ধামে প্রতি বছর বাৎসরিক ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। তখন পুরো নড়িয়া অঞ্চলে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং সুফি ও কাওয়ালি গানের এক জাদুকরী আসর বসে।
সুফিবাদ ও চিশতিয়া তরিকার অনুসারীদের জন্য এই দুটি দরবার শরীফ অত্যন্ত পবিত্র স্থান। আত্মশুদ্ধি ও ধর্মীয় জ্ঞান চর্চার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা এখানে আসেন।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য স্মারক হলো রাম সাধুর আশ্রম, যেখানে প্রতি বছর সাধুসঙ্গের আয়োজন করা হয়। অন্যদিকে, ধানুকার মনসা বাড়িটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এক ঐতিহাসিক তীর্থস্থান।
ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থানের পাশাপাশি শরীয়তপুরে এখন পারিবারিক বিনোদনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাও গড়ে উঠছে।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় শান্ত গ্রামীণ পরিবেশের মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে এই আধুনিক থিম পার্কটি।
কী আছে এখানে: একটি ছোটখাটো চিড়িয়াখানা, আধুনিক সুইমিং পুল, বাচ্চাদের জন্য নানা চমৎকার রাইড ও থ্রিডি সিনেমার ব্যবস্থা। পরিবার ও শিশুদের নিয়ে ছুটির দিনে কোয়ালিটি টাইম কাটানোর জন্য এটি শরীয়তপুরের সেরা জায়গা।
চমৎকার ইসলামী স্থাপত্যের নিদর্শন এই প্রাচীন মসজিদটি মুসলিম ঐতিহ্যের এক সুন্দর স্মারক। এছাড়া রাজনগর, কুরাশি ও মগর—এই ঐতিহাসিক গ্রাম ও অঞ্চলগুলো তাদের শান্ত আবহ ও খাঁটি গ্রামীণ সংস্কৃতির জন্য পর্যটকদের কাছে বেশ পরিচিত।
শরীয়তপুর ভ্রমণের জন্য শরৎকাল এবং শীতকাল (অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি) সবচেয়ে আদর্শ সময়। এ সময় নদীর আবহাওয়া শান্ত থাকে এবং বেড়িবাঁধে ঘুরে বেড়ানো বেশ আরামদায়ক হয়। তবে আপনি যদি পদ্মার রূপালী ইলিশের আসল স্বাদ এবং নদীর ভরা রূপ দেখতে চান, তবে বর্ষাকাল বা বর্ষা-পরবর্তী সময় (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) বেছে নিতে পারেন।
শরীয়তপুর গিয়ে পদ্মার টাটকা ইলিশ মাছ না খেলে আপনার ভ্রমণ অসমাপ্ত থেকে যাবে। আনন্দবাজার বেড়িবাঁধ বা জাজিরার ঘাট সংলগ্ন হোটেলগুলোতে গরম ভাতের সাথে লেজ ভর্তা আর ইলিশ ভাজা খাওয়া এক স্বর্গীয় অনুভূতি। এছাড়া জাজিরা অঞ্চলের মিষ্টি ও খাঁটি মহিষের দুধের দইও বেশ নামকরা।
ঢাকা থেকে এখন শরীয়তপুর যাওয়া জলভাতের মতো সহজ। ঢাকার গুলিস্তান, সায়েদাবাদ বা বাবুবাজার ব্রিজ থেকে শরীয়তপুর ও নড়িয়ার উদ্দেশ্যে সরাসরি বেশ কিছু ভালো বাস (যেমন: শরীয়তপুর পরিবহন, গ্লোরি পরিবহন, পদ্মা ট্রাভেলস) চলাচল করে। পদ্মা সেতু পার হয়ে জাজিরা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে এই বাসগুলো মাত্র ২ থেকে আড়াই ঘণ্টায় শরীয়তপুর জেলা সদরে পৌঁছে যায়।
আপনি যদি ঢাকা থেকে যান, তবে দিনে গিয়ে সব দর্শনীয় স্থান ঘুরে দিনেই ফিরে আসতে পারবেন। তবে যদি রাতে থাকতে চান, তবে শরীয়তপুর জেলা সদরে এবং নড়িয়া উপজেলায় বেশ কিছু আধুনিক ও মানসম্মত হোটেল এবং গেস্ট হাউস গড়ে উঠেছে। জেলা পরিষদের ডাক বাংলোতেও অনুমতি সাপেক্ষে থাকা যায়।
স্বপ্নের পদ্মা সেতুর জাদুকরী ছোঁয়ায় শরীয়তপুর এখন আর অবহেলিত কোনো দূরবর্তী জেলা নয়, বরং এটি এখন বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রের এক উদীয়মান তারকা। ইউরোপের বাজারে ঝড় তোলা পোড়ামাটির নিপুণ মৃৎশিল্পের কারিগরদের গ্রাম, উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক শিবলিঙ্গ, সুরেশ্বরের আধ্যাত্মিক সুফি সুর, আর আনন্দবাজার বেড়িবাঁধে আছড়ে পড়া পদ্মার ঢেউ—এই সবকিছুর এক অদ্ভুত ও মায়াবী আহ্বান রয়েছে এই জেলায়। একটি সপ্তাহের ছুটিতে যান্ত্রিক শহরের কোলাহল ছেড়ে পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসুন ঐতিহ্যবাহী শরীয়তপুর জেলায়; পদ্মাপাড়ের মুক্ত বাতাস আপনার মনকে এক নতুন সতেজতায় ভরিয়ে দেবে।
মন্তব্য